আমরা সবাই জীবন নামক রেলগাড়িতে বসে আছি—তার গন্তব্যস্থল হচ্ছে পরকাল। আমাদের স্বাধীনতা শুধু এতটুকুই—যতটুকু স্বাধীনতা থাকে একটা উড়ন্ত ঘুড়ির। মুক্ত আকাশে স্বাধীন মনে উড়ন্ত ঘুড়ি নিশ্চিন্তে উড়তে থাকে। নানা রঙের এই ঘুড়িগুলো তাদের ডানা মেলে শুধু উড়েই চলে। সে ভাবে, তাকে ছোঁয়ার মতো বুঝি কেউ নেই। অথচ নাটাই হাতে একজন বসে আছেন। আর সুতো ছেড়ে দিয়ে বলছেন—যা যতদূর পারিস উড়ে যা; তবে যখন সুতায় টান পড়বে তখন নিচে চলে আসতে হবে। মানবজীবন ঠিক তা-ই। আমরা যত শক্ত হাতেই দুনিয়াকে আঁকড়ে ধরি না কেন; মহান আল্লাহপাক চাইলে নিমিষেই আমাদের প্রত্যেককে তারই কাছে ফিরে যেতে হবে। এ কথাটি যদি আমাদের সকলের জানা থাকে, এর ভাবধারা যদি হৃদয় দিয়ে উপলব্দি করতে পারি। তাহলেই আমাদের জীবনের প্রতিটি কদম হিসেব করে দেওয়া সমীচীন হবে। ক্ষুদ্র দুনিয়ার; বিন্দু পরিমাণ সময়ের; অস্থায়ী এই জীবন আমাদের জীবন নয়। এক বিশাল সা¤্রাজ্য নিয়ে যে আখিরাত, সেই আখিরাতের স্থায়ী অনন্তকালের জীবনই হচ্ছে আমাদের জীবন।
.
মৃত্যু, ছোট্ট একটি শব্দ। এই সেই শব্দ, যা আমাদের নিয়ে যায় অজানা কোনো রাজ্যে, যার সম্পর্কে আমরা প্রায় কিছুই জানি না। সুন্দর এই পৃথিবী ছেড়ে যেতে কত না কষ্ট, যখন মৃত্যুর ডাক এসে যায়, প্রিয়তমা স্ত্রী, আদরের সন্তানেরা, সবচাইতে আপন বাবা-মা—কেউ তাদের বন্ধন দিয়ে ধরে রাখতে পারে না আমাদের। কত সুন্দর করে আমরা সাজাতে চেয়েছি আমাদের জীবন, কত পরিকল্পনা ছিল; সব মিলিয়ে যায় মাত্র দুটি অক্ষরের এই শব্দের দ্বারা। আমরা প্রতিদিন এই মৃত্যুকে কত আপনভাবে নিজের সাথে বয়ে বেড়াই আমরা নিজেরাও জানি না।
.
একবার শুধু স্মরণ করুন—আজ কতবার ভেবেছেন মৃত্যুর কথা? আপনি সমাজকে ভয় পান, অথচ যখন আপনার মৃত্যু হয়ে যাবে এই সমাজ আপনার কোনো কাজে আসবে না। আপনি স্বামী-স্ত্রীকে ভয় পান, অথচ এই স্বামী-স্ত্রীও আপনার কাজে আসবে না। মৃত্যু আমাদের কাউকেই রেহাই দেবে না। তাই স্মরণ করা উচিত সেই দিনের কথা—যেদিন আপনার চিৎকার কেউ শুনতে পাবে না, আপনার কাছে যে প্রশ্ন করা হবে তার উত্তর প্রদানে কেউ আপনার সাহায্যকারী হবে না। আসলে মৃত্যুর পর মানুষ যখন সমাহিত হয় তখন মূলত সে সমাহিত হয় না, চলে যায় আরেক জগতে, এ সত্যটি অনুধাবন করলে ছেলেপুলের নৈসর্গিক ভবিষ্যৎ নয়, নিজের পরকালীন ভবিষ্যৎ নিয়েই উৎকণ্ঠিত হতো সবচেয়ে বেশি। মৃত্যুর পর আমার কী হবে? এ ভাবনায় অস্থির হতো সবাই।
.
মৃত্যুর পর মানুষের অস্তিত্ব অবলুপ্ত হয়ে যায় না, এর সাথে সংযোজন ঘটে ভিন্নতর এক মাত্রার। মানুষের প্রবেশ ঘটে অন্য এক জীবনে—যা বর্তমান জীবনের তুলনায় অনেক বেশি বাস্তব, অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ। এ সত্যটি, বর্তমান বিশ্বের অধিকাংশ মানুষ—সে হোক ধার্মিক বা অধার্মিক; ভুলে গেছে বেমালুম।