হুদহুদ প্রকাশন থেকে প্রকাশিত মাওলানা মুহাম্মদ আবদুল আলিম সংকলিত মুসলিম নারীদের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ বই-
'নারী সমাজের ভুল ও প্রতিকার'
মুদ্রিত মূল্য ৪৪০/-
পৃষ্ঠা ৪১৬
বইটি সম্পর্কে কিছু কথা --
নারী। মানবসমাজের মূল চালিকা শক্তি। বাহ্যত আমরা দেখি নারী পরাধীনা। প্রকৃতপক্ষে তা নয়। নারীই মূলত সব পরিচালনা করে। নারীর উদরে মানুষের জন্ম। জন্মদায়িনীকে আমরা বলি ‘মা’। দুনিয়ার সবচেয়ে কোমল, মোহনীয় এবং সুন্দর ও আকর্ষণীয় শব্দ ‘মা’। আমরা যখন শিশু থাকি, তখন মা পরিচালনা করেন আমাদেরকে। তখন আমরা অনেক কিছুকে ভয় করি; ভয় করি না মাকে। অনেককে অমান্য করি; অমান্য করি না মাকে। কত জায়গায় যাই, আবার ফিরে আসি মায়ের কোলে। মা বলেন, ‘ঘুমোও এখন।’ আমরা ঘুমিয়ে পড়ি। মা বলেন, ‘ওঠো এখন।’ আমরা উঠে পড়ি। এভাবে আমাদের জীবনের প্রথম পরিচালনা থাকে মায়ের হাতে।
কিশোর বয়সে বোনের কথা আমরা ফেলতে পারি না। স্কুলে যাওয়ার সময় বোন বলে দেন, ‘দেখ্ বাবু! ছুটি হওয়ার পর কিন্তু ও পাড়ায় খেলতে যাবি না।’ আমার ও পাড়ায় খেলতে না গেলে ভাত হজম হয় না। কিন্তু ছুটির পর যখন ওদিকে পা বাড়াতে যাই, তখন কানে বেজে ওঠে, ‘দেখ্ বাবু! ছুটি হওয়ার পর...’ কথাটি। আর এগোতে পারি না। ফিরে আসি তখনই।
যুবক হয়ে গেলে আমরা আরও বেশি নারীর পরিচালনাধীন হয়ে পড়ি। তখন জীবনসঙ্গিনী প্রয়োজন হয় আমাদের। এরপর জীবনসঙ্গিনী যা বলে, সেই মোতাবেকই আমাদের চলা। সে যা আনতে বলবে, তাই আনা; সে করতে বলবে, তা-ই করা; সে যেখানে যেতে বলবে, সেখানেই যাওয়া। তার কথায় বিশ হাজার শ্রমিককে বাইশ বছর কাজে লাগিয়ে স্মৃতিশৌধ নির্মাণ করতেও আমরা দ্বিধা করি না। [সম্রাট শাহজাহান স্ত্রী মোমতাজের কথায় বিশ হাজার শ্রমিক বাইশ বছর খাটিয়ে তাজমহল নির্মাণ করেছিলেন, যা এখনও পৃথিবীর সাতটি আশ্চর্য বস্তুর অন্যতম।]
আমার এক বন্ধুর কাছে একবার একটি গল্প শুনেছিলাম। এখানে সেটি উল্লেখ করার লোভ সামলাতে পারছি না। গল্পটি এরকম- এক রাজা তার উজিরকে বলছেন, ‘উজির! কী বলো, প্রজারা তো আমার কথা ভালোই মান্য করে, তাই না?
না, মহারাজ! প্রজারা আসলে আপনার কথা যতটুকু মানে, তা শুধু আপনার ভয়ে। নির্ভয়ে তারা আপনার কথা একটুও মানে না।
তা হলে তারা মানে কার কথা?
সবাই যার যার স্ত্রীর কথায় চলে মহারাজ!
উজির! তোমার কথা সঠিক নয়; সবাই রাজার হুকুমেই চলে।
পরীক্ষা করুন, মহারাজ! দেখুন, তারা কার কথায় চলে।
ঠিক আছে, তুমি পরীক্ষার ব্যবস্থা করো, উজির!
উজির পরীক্ষার ব্যবস্থা করলেন। এলাকার লোকদের মধ্যে ঘোষণা হয়ে গেল, অমুক তারিখে রাজার দেউড়িতে সবাইকে জমা হতে হবে। সবাই যথাসময়ে জমা হয়ে গেল। দেউড়ির ঠিক মাঝখানে একটি দাগ কাটা। উজির ঘোষণা দিলেন, যারা রাজার কথা মান্য করে চলে, তারা দাগের পুব পাশে বসবে; আর যারা স্ত্রীর কথা মান্য করে চলে, তারা দাগের পশ্চিম পাশে গিয়ে বসবে। একজন বাদে সবাই দাগের পশ্চিম পাশে চলে গেল। সেই একজন ছিল ঠিক দাগের উপরে বসে; এদিকেও না, ওদিকেও না। রাজা কিছুটা সান্ত্বনা বোধ করছিলেন যে, হয়তো এই একটি লোক আমার কথা কিছুটা মান্য করে চলে। রাজা বললেন-
কী ব্যাপার, তুমি যে এদিকেও যাচ্ছ না; ওদিকেও যাচ্ছ না।
লোকটি জওয়াব দিল-
আমি আসার সময় আমার বউ বলে দিয়েছে, দেখো, তুমি কিন্তু রাজার কথায় ডানেও যাবে না; বামেও যাবে না। এজন্য মহারাজ! আমি কোন দিকেই যেতে পারছি না।
বাস্তব সত্য এটাই। মানুষ সবার কথা ফেলতে পারে; পারে না স্ত্রীর কথা ফেলতে। সম্রাট জাহাঙ্গীর স্ত্রী নুরজাহানের কথায় ইরানের বিশাল ফার্সী সাহিত্যকে আমদানী করে কোটি কোটি টাকা ব্যয় করে ভারতীয় ভাষায় অনুবাদ করার ব্যবস্থা করেছিলেন।
নারীসমাজকে আমরা রেল গাড়ির ইঞ্জিনের সাথে তুলনা করতে পারি। রেল গাড়ির ইঞ্জিন যেদিকে রোখ করবে, বাকি কম্পার্টমেন্টগুলো সেদিকেই যাত্রা শুরু করবে। ইঞ্জিন যদি ভুল করে কোন দিকে যাত্রা শুরু করে, তা হলে নির্দ্বিধায় বাকি কম্পার্টমেন্টগুলোও সেই ভুল করবে। নারী যদি পরিচালনায় ভুল করে, তা হলে পুরো সমাজকে সেই ভুলের খেসারত দিতে হবে। যদি সঠিক দিকনির্দেশনার মাধ্যমে সে পরিচালনার দায়িত্ব আঞ্জাম দেয়, তা হলে পুরো সমাজ সেই পরিচালনার সুফল ভোগ করবে। কিন্তু অত্যন্ত দুঃখের সাথে বলতে হয়, বর্তমান নারীসমাজে বেশিরভাগ ক্ষেত্রে পরিচালনার সেই যোগ্যতা অনুপস্থিত। ফলে প্রতিটি পদক্ষেপে আমরা তার খেসারত দিয়ে বেড়াচ্ছি।
বক্ষ্যমাণ বইয়ে নারীসমাজের সেইসব ভুলগুলো তুলে ধরতে চেষ্টা করেছি, যেগুলোর কারণে তারা তো বটেই পুরুষদের পর্যন্ত ভোগান্তি পোহাতে হচ্ছে। শুধু ভুলগুলো নির্দেশ করে ক্ষান্ত থাকিনি, শরীয়তের আলোকে সেগুলোর প্রকৃত সমাধান পেশ করারও চেষ্টা করেছি। একজন নারী নেককার হলে, পরিবারে তার যে কী পরিমাণ প্রভাব পড়ে, তা ভাষায় ব্যক্ত করা সম্ভব নয়; পক্ষান্তরে একজন নারী যদি বদকার হয়, তা হলে সমাজে তার যে কী পরিমাণ বদআসর প্রতিফলিত হয়, তা-ও ভাষায় ব্যক্ত করার মত নয়। নেককার নারীর সেই বিস্তৃত উপকারের দিকে ইঙ্গিত করেই মহানবী মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন-
اَلدُّنْيَا كُلُّهَا مَتَاعٌ وَخَيْرُ مَتَاعِ الدُّنْيَا الْمَرْأَةُ الصَّالِحَةُ.
পুরো দুনিয়া উপকারের বস্তু। আর দুনিয়ার উপকারের বস্তুগুলোর মধ্যে সর্বোত্তম হচ্ছে নেককার স্ত্রী। [সুনান নাসায়ী, হাদীস নং ৫৩৪৪]
আমাদের মহানবী সা.-এর এই হাদীসেরই আংশিক তরজমা পেশ করেছেন নেপোলিয়ন বোনাপোর্ট-
If you give me a good mother, I shall give you a good nation.
যদি তোমরা আমাকে একজন ভালো মা দাও, তা হলে আমি তোমাদেরকে একটি ভালো জাতি উপহার দিব।
বাস্তব সত্য এটাই, মা বা মাতৃজাতি যদি সঠিক পথে চলেন, তা হলে গোটা সমাজ সঠিক পথে চলবে। সেই সঠিক পথে চলার কিছু দিকনির্দেশনা দেওয়ার চেষ্টা করেছি এই বইয়ে। অনেক কিছু বলেছি; অনেক কিছু বলা হয়নি। যা বলেছি, পূর্বসূরিদের নিয়ম অনুসারে উদ্ধৃতি দিয়ে বলার চেষ্টা করেছি। উদ্ধৃতি ছাড়া যে কথাগুলো বলেছি, সেগুলোর পরিমাণ কম। সেগুলোও পূর্বসূরিদের কথাই বটে; কিন্তু কারণবশত রেফারেন্স ছেড়ে দিয়েছি।
মনে রাখতে হবে, এটি কোন ফতোয়ার কিতাব নয়। এজন্য এটি পড়েই কোন প্রকার মাসআলা বা ফতোয়া প্রদান করা যাবে না। আমি একজন হানাফী এবং হানাফী মাজহাব অনুসরণ করেই জীবন যাপন করি। কিন্তু এই বইয়ের কোন কোন স্থানে আলোচনায় জোর সৃষ্টি করতে গিয়ে গরহানাফী বক্তব্যও আমি তুলে ধরেছি। সেগুলোর সূত্র ধরে প্রকৃতি না বুঝে সমাজে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করলে মারাত্মক অন্যায় হবে।
বইটি যিনি পড়বেন, তাকে বলব খুব সচেতনভাবে পড়তে। তাড়াহুড়া না করে বুঝে বুঝে পড়তে। পাঠক/পাঠিকার মধ্যে যেই অভাবটি রয়েছে, সে কথাটি যখন আসবে, তখন সেটিকে উজ্জ্বল মার্কারি কলম দ্বারা সনাক্ত করলে, অথবা লাল কালির কলম দ্বারা আন্ডারলাইন করলে বিষয়টি মনে থাকবে। এই বইয়ের অনেক বিষয়ই পরিবারের দুই তিন জন নারী একত্রে বসে তালীমের পদ্ধতিতে পাঠ করা যাবে। তবে দুচারটি আলোচনা এমন আছে, যেগুলো সম্মিলিতভাবে উচ্চ স্বরে পড়তে গেলে পরিবেশ বিঘ্নিত হবে। সেগুলো নীরবে পড়ে নেওয়া বাঞ্ছনীয়।
বইটিতে বেশিরভাগ ক্ষেত্রে শুধু নারীর করণীয় আলোচনা করা হয়েছে। এজন্য কখনও কখনও লেখক পক্ষপাত করেছেন বলে সন্দেহ হতে পারে। মূলত বিষয়টি তা নয়। আল্লাহ সুযোগ দিলে কোন দিন যদি পুরুষসমাজের করণীয় সম্পর্কে কোন বই লিখে দিতে পারি, তা হলে বিষয়টি পরিষ্কার হয়ে যাবে। ইসলামী শরীয়তের আলোকে পুরুষ ও নারীর কর্তব্য অত্যন্ত ভারসাম্যপূর্ণ। কোন পক্ষের উপরই অতিরিক্ত বোঝা চাপানো হয়নি।
বইটি পড়ে কোন পাঠিকার মনে সন্দেহ জাগতে পারে যে, লেখক হয়তো এর মাধ্যমে নারীজাতিকে বাঁদী-দাসীতে পরিণত করতে চেয়েছেন, বিষয়টি মোটেও ওরকম নয়। আমি আসলে নারীকে নেতৃত্ব দানের মন্ত্র শিখিয়েছি। কোন পাঠিকা এর উপর আমল করলে অল্প দিনের মধ্যেই বিষয়টি স্পষ্ট হবে বলে আমি বিশ্বাস করি।
বইয়ে উদ্ধৃত আয়াত ও হাদীসের রেফারেন্সের ক্ষেত্রে আমি নম্বর পদ্ধতি অনুসরণ করেছি, যাতে যেকোন ব্যক্তি যাচাই করতে চাইলে খুব সহজে তা করতে পারেন। অপেক্ষাকৃত বিশুদ্ধ হাদীসগ্রন্থে কোন হাদীস পাওয়া গেলে, টিকায় সেটির তথ্য উল্লেখ করে ক্ষান্ত থেকেছি। যেমন কোন হাদীস যদি বিশুদ্ধ ছয় কিতাবের সবগুলোতেই পাওয়া যায়, তা হলে আমি শুধু বুখারীর তথ্য উলেখ করে সমাপ্তি দিয়েছি।
...........
সূচিপত্র... ... ...
মানব সৃষ্টির তরীকা
নারীজন্মকে স্বাগতম
সন্তান দেওয়ার মালিক আল্লাহ
মায়ের আমলের প্রভাব সন্তানের উপর
প্রচার নয়; নীরবতা কাম্য
মানুষও প্রাকৃতিক নিয়মের ঊর্ধ্বে নয়
মেয়ের কানেও আযান একামত শুনানো সুন্নত
বিস্মৃতির আঁধারে প্রসবপরবর্তী একটি সুন্নত
কুসংস্কারে আচ্ছন্ন কতগুলো দিন
নাম নিয়ে নানা কাণ্ড
দুধ দেওয়ার আগে একটু ভাবুন
দুধদানের সময় লক্ষণীয় কয়েকটি কয়েকটি বিষয়
সন্তানের প্রথম কথা
ঘুমপাড়ানী গান
শিশুর নানাবিধ যত্ন
শিশুর পোশাক
মৌখিক শিক্ষা
মেয়ের প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা
আমাদের আজকালের অবস্থা
নামাযের নির্দেশ
সন্তানকে বুঝানোর পন্থা
শিক্ষাদান পদ্ধতি
নিয়ত শিক্ষা দিন
কিছু আদবকায়দা
খাওয়া-দাওয়ার আদব
লেবাস-পোশাক পরিধান করার আদব
মেহমানদারী সংক্রান্ত আদব
সালাম-কালামের আদব
মজলিশের আদব
হাই-হাঁচির আদব
নিদ্রা ও শোয়ার আদব
স্বপ্ন দেখাসংক্রান্ত আদব
সফরের আদব
পরিচ্ছন্নতা সংক্রান্ত আদবকায়দা
মহিলা ও বালিকাদের স্বতন্ত্র কিছু আদব
বিবিধ আদব
রজঃস্রাব
সবখানে লজ্জা নয়
বাড়ির মেহমান
মাবাবার খেদমতের এখনই সময়
হিংসা মহাপাপ
অহঙ্কার ছাড়ো; বিনয় ধরো
গীবত ও শেকায়েত
সুদের সাথে মাখামাখি
গান নয়
পর্দা জুলুম নয়; অনুগ্রহ
যুক্তরাষ্ট্রে মিনিটে ২৪ ধর্ষণ
ইসলামে পর্দার বিধান
পর্দার জন্য বোরকা জরুরী
বিপদকালের পর্দা
চিকিৎসার সময়ের পর্দা
দুলাভাই ও দেবর
অন্ধ ব্যক্তি থেকে পর্দা
না-মাহরামের বাড়িতে রাতযাপন
নারীর সাথে নারীর এবং পুরুষের সাথে পুরুষের পর্দা
পরপুরুষের সাথে মুসাফা করা
সুইমিং পুল ও নদীতে গোসল
লজ্জা ও ঈমান সহচর
নারীর পোশাক-পরিচ্ছদ
কিছু নারী জান্নাতের ঘ্রাণও পাবে না
প্রসাধনী ও নারীসমাজ
অলঙ্কার ও মূল্যবান পোশাক
নারীর গায়ে পুরুষের পোশাক
প্রেম ও যেনা
নারীর আয়-উপার্জন
বিবাহ-শাদী
যৌতুক অভিশাপ
বিয়ে ও আড়ম্বরতা
মোহর
শ্বশুরালয় অভিমুখে
রুখসতকালে মায়ের হেদায়েত
রুখসতকালে কন্যার প্রতি বাবার নসীহত
স্বামী-স্ত্রীর প্রথম সংলাপ
বাসর রাতের কতিপয় আদব
স্ত্রীজীবনের সাফল্যের চাবি
নেককার স্ত্রীর পাঁচটি বৈশিষ্ট্য
দ্বিতীয় বৈশিষ্ট্য
তৃতীয় বৈশিষ্ট্য
চতুর্থ বৈশিষ্ট্য
নেককার স্ত্রীর পঞ্চম বৈশিষ্ট্য
স্বামীর সাথে জীবন পরিচালনার নিয়ম
স্ত্রীসমাজের মনের চাহিদা
স্বামীকে ভালোবাসতে শেখো
জয় করো স্বামীর মন
দৃঢ় করো ভালোবাসার বন্ধন
জেনে নাও স্বামীর পছন্দ
হয়ে যাও স্বামীর পছন্দনীয়
পুরুষরা কী পছন্দ করে
স্বামী-স্ত্রীর ঝগড়া নিরসনের দুইটি মন্ত্র
গোস্বা দমন
কতিপয় পরামর্শ
আলিঙ্গন
যদি স্বামী হয় না-ফরমান
স্বামীর একাধিক বিবাহ
তোমার শাশুড়ী তোমার আয়না
যদি তুমি কখনও শাশুড়ী হও
শেষ নিবেদন
গ্রন্থপঞ্জি